logo logo

নবম-দশম শ্রেণীর পাঠ্য বাংলা বই সমাচার

Text Books Bangladesh

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ডকে আরো শক্তিশালী করতে, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সাধনা করে আমরা যে শিক্ষানীতি পেলাম, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় সেটা কতটুকু কার্যকর ও সফল হয়েছে সে বিষয়ে সুধী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই এ লেখার অবতারণা। বর্তমান সরকার শিক্ষা বিষয়ে অনেক দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছে যা সকলেরই মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। যেমন – নতুন পদ্ধতি (সৃজনশীল) প্রণয়ন, পাঠ্যসূচীতে পরিবর্তন, বিনামূল্যে বই বিতরণ প্রভৃতি। তবে একজন শিক্ষানুরাগী হিসেবে বলতে চাই, সরকার যে উদ্দেশ্যে নতুন পদ্ধতি (সৃজনশীল) প্রণয়ন করেছে ও পাঠ্যসূচীতে পরিবর্তন এনেছে তা সর্বাংশে সফল হয়নি। এ দু’টি বিষয়কে কার্যকর করার জন্য যে উপকরণ প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের কাছে তা যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি। যেমন, নবম-দশম শ্রেণীর ‘মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য’ বইটিতে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে যে গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও নাটক পাঠ্য করা হয়েছে তা আমার বিবেচনায় যুগোপযোগী নয়।বইটির লেখক ও সংকলক এবং সম্পাদকমণ্ডলী আমার শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিবর্গ । আমি উনাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে ও নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেই বলতে চাই, বইটির বিষয়বিন্যাস শিক্ষার্থীবান্ধব নয়। বিনয়ের সঙ্গেই আমি এই মতের পক্ষে কিছু যুক্তি নিচে উপস্থাপন করছি।১. শিক্ষার্থীদের মূল শক্তি তাদের পাঠ্যবই, কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আমাদের পাঠ্যপুস্তকে বিষয়বস্তুর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি। একজন শিক্ষার্থিী নবম-দশম শ্রেনীতে যা শিখছে একাদশ–দ্বাদশ শ্রেণীতে অনেকাংশে তার বিপরীত অথবা তার থেকে অনেক কঠিন বিষয় তাকে পড়তে হচ্ছে যা তার পক্ষে অনুধাবন করা দুরুহ হয়ে পড়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘কপোতাক্ষ নদ’ পড়ে তার পক্ষে ‘বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ’ আত্মস্থ করা খুবই কঠিন।২. বিষয়বিন্যাসে রয়েছে একঘেঁয়ে ও অদূরদর্শী চিন্তার প্রতিফলন। স্বাধীনতা বিষয়ে গল্প ও কবিতার মধ্যে ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ এবং ‘সাহসী জননী বাংলা’ কবিতা দু’টি রাখা হয়েছে। আমার মতে এ দু’টি কবিতার পরিবর্তে ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ আর ‘আমার পরিচয়’ কবিতা রাখা যেত অথবা নির্মলেন্দু গুণের ও কামাল চৌধুরীর স্বাধীনতা বিষয়ক অন্য কবিতা দেওয়া যেতে পারত।আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও বিনয়ের সঙ্গে এটি বলছি কারণ আমি জানি তাঁদের এর থেকে অনেক ভাল স্বধীনতা বিষয়ক কবিতা রয়েছে।পাঠ্যপুস্তকে বিষয় নির্ধারণ করা হয় শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত শক্তির জাগরণ ও তার সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ সাধনের লক্ষ্যে যা পরবর্তীকালে সামাজিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু আমাদের পাঠ্যক্রমে আগের কিছু গল্প-কবিতার পরিবর্তে এমন কিছু গল্প-কবিতা নির্বাচন করা হয়েছে যেগুলো আগেরগুলোর সমমানের বা তাদের চেয়ে ভাল নয়। উদাহরণ, সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘দুর্মর’ কবিতা রাখা হলো না। আবার ‘পালামৌ’ গল্প থেকে আমার বিবেচনায় ‘পারী’ শিক্ষার্থীদের বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করত। ‘মহেশ’ গল্পের যে সামাজিক ও শিল্পমূল্য রয়েছে ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের সেই সামাজিক ও শিল্পমূল্য আছে কি?বাংলা ছোট গল্পের সার্থক রূপকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’র পরিবর্তে ‘দেনাপাওনা’ নির্বাচন করা হয়েছে হয়ত একাদশ শ্রেণীর বিবেচনায় যেখানে ‘হৈমন্তী’র পরিবর্তে ‘অপরিচিতা’ নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ‘হৈমন্তী’ ও ‘দেনাপাওনা’ একই বিষয়ের হলেও ‘দেনাপাওনা’ ও ‘অপরিচিতা’ একই বিষয়ের নয়, আবার ‘ছুটি’ গল্পে শিক্ষার্থীরা যে আকর্ষণ পেত ‘দেনাপাওনা’তে তারা তা পাবে না। তাহলে আমাদের নির্বাচকমণ্ডলী কি বাংলা ছোট গল্পের সার্থক রূপকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’র পরিবর্তে অন্য কোনো গল্প পেলেন না!এবার ‘সাহিত্যের রূপ ও রীতি’ প্রবন্ধের বিষয়ে আসি। এর নাম থেকেই বুঝি এটি একটি তত্ত্বমূলক প্রবন্ধ যা আমার বিবেচনায় নবম-দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর জন্য খুব জরুরী নয়। তারপরও এটা থাকলে শিক্ষার্থীরা সাহিত্যের আঙ্গিক সম্পর্কে জানতে পারবে, কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এখানে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও নাটক, কোনোটি সম্পর্কেই সুন্দর ও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। তাহলে আমার প্রশ্ন এরকম অস্পষ্ট বিষয় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার কী প্রয়োজন? উদাহরণ হিসাবে আমি কবিতার ও প্রবন্ধের বিষয়টি উপস্থাপন করতে চাই। প্রথমে কবিতার সংজ্ঞায় বলা হলো: ‘‘ছন্দোবদ্ধ ভাষায়, অর্থাৎ পদ্যে যা লিখিত হয় তাকেই আমরা ‘কবিতা’ বলি। কবিতার প্রধান দুটি রূপভেদ হলো – মহাকাব্য ও গীতিকবিতা।” এরপর মহাকাব্য ও গীতিকবিতা নিয়ে সামান্য আলোচনা হয়েছে। এখানে একজন পাঠক হিসেবে আমার কৌতূহল, পদ্য ও কবিতা কি একই? আধুনিককালের শুরু থেকেই এ বিষয়ে নানা মতভেদ চলে আসছে এবং শে‌ষ পর্যন্ত পদ্য ও কবিতার প্রভেদ ও সম্পর্ক বিষয়ে সুচিন্তিত মত প্রতিষ্ঠিতও হয়েছে। যা হোক, এত জটিল বিষয় নবম-দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর জন্য খুব জরুরী নয়। আমার আরো একটি ছোট প্রশ্ন, এ পাঠ্যবইটির শ্রদ্ধেয় লেখক ও সংকলক এবং শ্রদ্ধেয় সম্পাদকমণ্ডলীর কাছে – যদি কোনো শিক্ষার্থী তার শিক্ষকের কাছে জানতে চায় পাঠ্যপুস্তকের কোনটি মহাকাব্য আর কোনটি বা গীতিকবিতা, তখন শিক্ষক কী উত্তর দেবেন? হয়তো জিজ্ঞাসু শিক্ষার্থীকে তিনি নিজের মতো করে একটা উত্তর দেবেন কিন্তু সেই উত্তরটা সঠিকভাবে দেওয়ার যথেষ্ট প্রস্তুতি তাঁর আছে কিনা তা ভাবার বিষয়। আবার বইটিতে আধুনিক কবিতাও আছে কিন্তু আধুনিক কবিতা কী সে বিষয়ে প্রবন্ধটিতে কোনো আলোচনা নেই।লেখা আর বাড়াতে চাই না, শুধু একটি অনুরোধ করে শেষ করব – যাঁরা আমার লেখাটি পড়বেন তাঁরা নবম-দশম শ্রেণীর ‘মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য’ বইটি পড়ে তাঁদের সুচিন্তিত মত দেবেন।আলোকচিত্র: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত

bottom

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bottom